বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণহত্যা মামলায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়ার পর তার পরবর্তী পরিণতি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে। দণ্ড ঘোষণার আগেই ছাত্র–জনতার গণআন্দোলনের চাপে দেশত্যাগ করে ভারতের দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফেরানোর প্রশ্নে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে ইন্টারপোল।
চার দশকের রাজনৈতিক প্রভাবের মালিক শেখ হাসিনা একসময় ছিলেন বাংলাদেশের দীর্ঘতম সময়ের ক্ষমতাসীন নেতা। সমালোচকদের কাছে “স্বৈরাচার” বা “ফ্যাসিস্ট” বলে পরিচিত হলেও, সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন উন্নয়নের রূপকার। কিন্তু এই শক্ত অবস্থান ধসে পড়ে ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানে।
১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার জাতীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন। ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ছয় বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে তিনি ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত করেন দলকে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী এবং ২০০৮ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর তার ক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হয়। সংবিধান সংশোধন, রাজনৈতিক বলয় গঠন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিজের কেন্দ্রে নিয়ে আসা—এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয় শেখ হাসিনা–কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা।
২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪—তিনটি নির্বাচনে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ক্ষমতা ধরে রাখেন তিনি। অভিযোগ ওঠে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, রাতের ভোট এবং নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে। এ নিয়েই বাড়তে থাকে জনঅসন্তোষ।
২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের আন্দোলন দ্রুত রূপ নেয় বৈষম্যবিরোধী গণবিক্ষোভে। সরকারপক্ষের দমন-পীড়ন ও গুলিবর্ষণে বহু মানুষের মৃত্যু জনরোষকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়। টিকে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও গণভবনের দিকে লাখো মানুষের অগ্রযাত্রার মুখে আগস্টের ৫ তারিখ দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই শুরু হয় জুলাই গণহত্যা ও ক্ষমতার অপব্যবহার-সংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধান আসামি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আসে মৃত্যুদণ্ড।
বর্তমানে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কি না—তা এখন দুই দেশের কূটনৈতিক ও আইনি আলোচনার বিষয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হলে তার পরিণতি কী দাঁড়াবে, তা–ই এখন দেখার অপেক্ষা।
